বোহেমিয়ান লেখক আহমেদ ছফার আজ জন্মবার্ষিকী - Alorpoth24.com | সত্য প্রকাশে কলম চলবেই

শিরোনাম

29 June, 2020

বোহেমিয়ান লেখক আহমেদ ছফার আজ জন্মবার্ষিকী


হাসান সোহান, জবি,ঢাকা,প্রতিনিধি:
বিশিষ্ট​ বাংলাদেশি​ লেখক, ঔপন্যাসিক, আহমদ ছফার আজ ৭৮তম জন্মবার্ষিকী। তিনি একাধারে কবি, চিন্তাবিদ ও​ গণবুদ্ধিজীবীও​ ছিলেন।​ জাতীয় অধ্যাপক​ আব্দুর রাজ্জাক​ ও​ সলিমুল্লাহ খানসহ আরো অনেকের মতে, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন আহমদ ছফা।​ তাঁর লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে।

আহমদ ছফা জন্মগ্রহণ করেন​ ১৯৪৩​ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে জুন​ চট্টগ্রামের​ চন্দনাইশ উপজেলার​ হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। তাঁর পিতা হেদায়েত আলী এবং মাতা আসিয়া খাতুন।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে​ ম্যাট্রিকুলেশন​ পাশ করেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন; একই বৎসরে ভর্তি হন​ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে​ বাংলা বিভাগে। পরে বাংলা বিভাগে ক্লাশ করা অব্যাহত রাখেননি। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে​ ব্রাহ্মণবাড়িয়া​ কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির​ পিএইচডি​ গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের জন্য জাতীয় অধ্যাপক​ আব্দুর রাজ্জাকের​ সান্নিধ্যে আসেন। দীর্ঘকাল তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দেন। মৌখিক পরীক্ষা হয় একুশে মার্চ। পিএইচডি সম্পন্ন করা পরে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠন ও এর বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নেন। ৭ই মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা’ হিসেবে প্রতিরোধ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে রচিতবুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস​ (১৯৭২) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানচিত্র অঙ্কন করেন এবং বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদিতার নগ্ন রূপ উন্মোচন করেন তথা বুদ্ধিজীবীদের সত্যিকার দায়িত্বের স্বরূপ ও দিকনির্দেশনা বর্ণনাপূর্বক তাদের সতর্ক করে দিতে বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের কী দুর্দশা হতে পারে তা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন।

ছফা রচিত প্রতিটি উপন্যাসই ভাষিক সৌকর্য, বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর অভিনবত্বে অনন্য।​ আবুল ফজল​ ও আরো অনেকের মতে ছফার​ ওঙ্কার​ (১৯৭৫) বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোত্তম সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে রচিত​ গাভী বিত্তান্ত​ (১৯৯৫) বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসগুলোর একটি।

সলিমুল্লাহ খান ও আরো অনেকের মতে, আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্ব সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক। রেখেছেন দীপ্তিময়ভাবে। গল্প, গান,​ উপন্যাস,​ কবিতা,​ প্রবন্ধ,​ অনুবাদ,​ ইতিহাস,​ ভ্রমণকাহিনি​ মিলিয়ে তিরিশটির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো, সূর্য তুমি সাথী​ (১৯৬৭)​ ,ওঙ্কার​ (১৯৭৫)​ ,একজন আলী কেনানের উত্থান-পতনে​ (১৯৮৮), মরণবিলাসে​ (১৯৮৯), গাভী বিত্তান্ত​ (১৯৯৫),পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ​ (১৯৯৬), অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী​ (১৯৯৬)।

আহমদ ছফা ও তাঁর রচনাকর্ম অনেক লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকর ও বুদ্ধিজীবীকে অনুপ্রাণিত করেছে; তাঁদের মাঝে অন্যতম​ হুমায়ূন আহমেদ,​ ফরহাদ মজহার,​ মুহম্মদ জাফর ইকবাল,​ তারেক মাসুদ এবং​ সলিমুল্লাহ খান।​ বর্তমানে ছফা স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী বলে বিবেচিত।

জীবিতকালে আহমদ ছফা তাঁর প্রথাবিরোধিতা, স্পষ্টবাদিতা, স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য লেখক ও বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ আলোচিত ও বিতর্কিত ছিলেন। জীবদ্দশায় অনেকে তাঁকে বিদ্রোহী,​ বোহেমিয়ান, উদ্ধত, প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাহীন ও বিতর্কপ্রবণ বলে অভিহিত করেছেন।

ছফা বলেন, সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা ‘প্রয়োজনে-ঠেলায়’ পড়ে বিশেষ বিশেষ ঘটনার আগে যে ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি দেন, ঘটনার পরে লেখেন তার উল্টো কাসুন্দি। ফলে তাঁদের কোনো চিন্তা-কর্ম-উপদেশ সমাজের বিশেষ কোনো কাজে আসে না।তাই ছফা বলেন, বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামো আমূল পরিবর্তন হবে না।

“আমি জাতি হিসেবে বাঙালি মুসলমানের অপূর্ণতা, অক্ষমতা এবং অসহায়তার দিকটাই তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। বাঙালি মুসলমানরা এ দেশের মাটির আসল সন্তান। তারা প্রভুত্বকামী আর্যদের সঙ্গে যেমন সম্পর্কিত নয়, তেমনি আগ্রাসী তুর্কি, তাতার, ইরানী, তুরানীদেরও কেউ নয়। শুরু থেকেই বাঙালি মুসলমান একটা নির্যাতিত মানবগোষ্ঠী।”
—আহমদ ছফা, ১৯৯৪

প্রতিষ্ঠানবিরোধী​ আহমদ ছফা ১৯৭৫ সালে লেখক শিবির পুরস্কার ও ১৯৯৩ সালে​ বাংলা একাডেমির​ সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।​ ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সাহিত্যে মরণোত্তর​ একুশে পদক​ প্রদান করেন।

আহমদ ছফা ছিলেন সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং আদর্শনিষ্ঠ ও প্রগতিপন্থি একজন সংস্কৃতিকর্মী। প্রগতির সংঘশান্তিতে তিনি আস্থাবান ছিলেন। তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতাও ছিল প্রচুর। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে​ ​ বাংলাদেশ লেখক শিবির​ গড়ার মুখ্য ভূমিকাও পালন করেন তিনি। মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশভূমিতে প্রগতির তরুণ সৈনিকদের অভ্যুদয় ছফার কাঙ্ক্ষিত ছিল। এজন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজে আরও মানববাদী সংগঠন গড়ে তোলেন কিংবা প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল সংগঠকের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এই মহান অকৃতদার ব্যাক্তির মৃত্যু ২০০১ সালের ২৮ জুলাই।​

No comments:

Post a Comment